Post Image
svgfahmesvgJuly 26, 2022svgFiction

প্রাক্তন: পর্ব ৩ – প্রেমাতাল

**reader discretion is advised**

দরজার ওপর এলিয়ে পড়ল একটা দীর্ঘ ছায়া। শরীফের এমনিতেই লম্বা শরীরটা আরও লম্বা হয়ে ছায়া আকারে হেলে পড়েছে কোন একটা আলো এসে পড়াতে।

আলোর উৎস খুঁজতে ঘুরে তাকালো শরীফ।

গাড়ির হেডলাইটটা চোখে লাগায় একটু সামনে আগালো সে। এই গাড়ি সে চেনে না। কে এসেছে? কেন এসেছে? নিজের অজান্তেই হোলস্টারে হাত চলে গেল শরীফের।

গাড়ি থেকে কোন প্রকার তাড়াহুড়ো ছাড়াই নেমে এল শান্তা, কোলে বাচ্চা।

“কোথায় ছিলে তুমি!”
“কোথায় ছিলাম মানে? তুমি টেক্সট পাওনি আমার? নাকি ফোন এখনও বন্ধ তোমার?”

কাজ করতে করতে কখন যে ফোনের চার্জ শেষ হয়ে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, সেটা শরীফ টেরও পায়নাই। আজ শপিং এর ডেট ছিল, তার খেয়াল নেই সেটাও। শান্তা অপেক্ষা করতে করতে শেষমেষ নিজেই চলে গেছে।

“গাড়ি নিলে না যে?”
“ব্রেক শু পাল্টানো লাগবে। রিস্ক নিই নাই এজন্যে।”
“ওহ আচ্ছা”, দরজা খুলতে খুলতে বলল শরীফ।
“তোমার এত দেরি কেন হল এটা জিজ্ঞাসা করে তো লাভ নাই, কিন্তু তুমি বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলে কেন ঘরে না ঢুকে, সেটা বলো”, শান্তা কিছুটা অবাক এবং বিরক্ত।
“ওহ না, আমি মাত্র ঢুকেছি। বস ড্রপ করেছে আমাকে আজকে।”
“কই, তোমার বসের গাড়ি তো দেখলাম না। ওহ ওয়েট!”
শরীফের পকেট হাতড়ে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করল শান্তা।
“এই মহাশয়কে খুঁজতে আগেই নেমে পড়েছ, তাইনা?”
বলেই শান্তা বাইরে ফেলে দিল প্যাকেটটা। শরীফ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আজ রাতে আর কাজ করা হবে না, ঘুমই ভরসা।

শেষ কবে এত প্রেমকাহিনী নিয়ে গবেষণা করেছে মনে পড়ছে না শরীফের। সাহিত্যিকদের বর্ণাঢ্য প্রেমজীবনের কথা টুকটাক জানা ছিল আগে থেকেই। বিশ্বখ্যাত বায়রন যেমন অগণিত প্রেম করেছেন তার ছোট্ট জীবনে, কিন্তু তার প্রথম প্রেমটা কিন্তু বিয়োগান্তক ছিল। বিশ্বাস করে বন্ধুকে বলেছিলেন তার ভাল লাগার কথা। ওই বন্ধু ভাল লাগার সংবাদ বাহক হতে গিয়ে নিজেই প্রাপিকার প্রেমে পড়ে গিয়ে প্রপোজ করে বসেন, এবং মেরি সেটা গ্রহণও করেন। এরপর থেকে নারীজাতির উপর বিতৃষ্ণা নিয়ে একের পর এক প্রেম করে গেছেন বায়রন, আর তার এই প্রেম উপাখ্যান তার অমর সাহিত্যের মতই বিখ্যাত (অনেকের কাছে কুখ্যাত)। শরীফের পড়ালেখা অবশ্য এখন বায়রনকে নিয়ে নয়, বাংলাদেশি মধ্যবয়স্ক এই সিঙ্গেল (!) লেখককে নিয়ে। তার মৃত্যুর পর টিকটকে একদিন ট্রেন্ডিং ছিল তার নাম। অনেক কিশোর কিশোরী কান্নাকাটি করে সেটার টিকটক বানিয়ে আপলোড করেছে। এত্ত এত্ত ভক্তের মধ্যে সন্দেহজনক কাউকে খুঁজে বের করা অসম্ভব। লেখকের ফোন আনলক করে সেখান থেকে কিছু উদ্ধার করে গিয়েছে, কিন্তু সমস্যা হয়েছে ডেটিং অ্যাপগুলো নিয়ে। ইমেইল আইডি থেকে হিস্টোরি ঘেঁটে দেখা গিয়েছে যে একাধিক ডেটিং অ্যাপ এ ওই আইডি থেকে একাউন্ট খোলা হয়েছে। কিন্তু ওসব অ্যাপের অনেক কনভার্সেশনই এখন আর নাই, ডীলিট করা হয়ে গেছে বলে ধারণা শরীফের। যেগুলো রয়ে গেছে, সেগুলো পড়তে পড়তে এমন একটা অবস্থা যে ওইসব কনভার্সেশন থেকে অলরেডি শান্তাকে ডায়লগ মেরে দিয়েছে দু একটা বাসায় গিয়ে গত কদিনে। অধিকাংশ মেয়েই শব্দ প্রশংসা শুনতে পছন্দ করে। শান্তাও ব্যতিক্রম নয়।

এক সপ্তাহ পর শপিং মলে বসের সাথে দেখা। শুরুর দিকে যেভাবে মাইক্রোম্যানেজের টেনডেন্সি দেখিয়েছিলেন সেটা অনেকটাই স্তিমিত হয়ে গেছে অলরেডি। গত এক সপ্তাহ তেমন একটা কথাবার্তা বলেন নাই কেস নিয়ে ওর সাথে। অবশ্য গত কদিন খালি মৃত লেখকের প্রেমজীবন নিয়েই ব্যস্ত ছিল শরীফ। ধন সম্পত্তি, জমিজমা, ব্যক্তিগত বিবাদ- ওর জুনিওর সিনিয়র কলিগরা একেকজন একেক মোটিভের সম্ভাবনার কথা বললেও, কেন যেন শরীফের মনে হচ্ছিল- রহস্য প্রেমেই লুকানো।

শপিং মলের ফুড কোর্ট গুলো আজও ঠিক আগের মতই ডিসকাউন্টেড কোয়ালিটির রয়ে গেছে। দুজনেরই বার্গার খেতে ইচ্ছে করায় বের হয়ে কাছেই একটা বার্গার জয়েন্টে যাবার সিদ্ধান্ত হল। বার্গার অর্ডার করে বসল দুজন।

“তারপর? প্রেমকাহিনী পড়া শেষ হলো তোমার?”
“ও কী আর সম্ভব, স্যার? লোক তো সেই প্লেয়ার ছিলেন, শব্দের যাদুকর!”
“হাহাহা! তুমিও মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেছ দেখছি।”
“না স্যার, আমি তো প্যাঁড়ায় আছি। জীবনে এই প্রথম কোন এক কেস পেলাম যার কোন কূলকিনারা পাচ্ছিনা।”
“আমার জীবনেও এরকম একবার হয়েছিল, বুঝলে?”
“বলেন কী স্যার! এরকম কেস?”
“নাহ। তবে এক্কেবারে ফাঁসানো কেস। কিচ্ছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না।”
“শেষমেষ সুরাহা করতে পেরেছিলেন?”
“কী কাহিনী হল, কীভাবে হল কিচ্ছু না জিগ্যেস করে একেবারে শেষ চ্যাপ্টারে চলে গেলে হে? এই তোমাদের নিয়ে হল বিপদ। খালি ডেস্টিনেশনে যেতে চাও, জার্নিতে ফোকাস কম তোমাদের। অথচ, আসল মজা এই জার্নিটাই।”
“পুরোটাই বলুন, স্যার।”
“নাহ, পুরোটা বলার আজ সময় নেই। তুমি উপসংহার জানতে চেয়েছিলে না? ফেঁসে যেবার গিয়েছিলাম বিয়েই করে ফেলেছিলাম, বুঝেছো? আর যাকে করেছি, তার একটা স্পেশাল অকেশান আছে, যার গিফটটা নিতে আমি ভুলে গেছি। আমি আমার বার্গারটা টেক এওয়ে নিচ্ছি, তোমারটা তুমি খেয়ে আস্তে ধীরে যাও, কেমন?”
“ওহ ওকে, শিওর স্যার।”
“ওহ হ্যাঁ, শরীফ। বলতে ভুলে গেছি। একদিন আসো বাসায়, ককটেল পার্টি হোক। তোমার ওয়াইফকেও নিয়ে আসলা, তাহলে আমি তুমি গল্প করতে পারব আমাদের মত করে, হাহা।”
“ওহ থ্যাংক ইউ, স্যার। কিন্তু শান্তা আবার এসব ককটেল , ওয়েল স্মোকিংও নিতে পারে না।”
“আরেহ ওসব বিষয় না। তাহলে ডীনার পার্টিই হবে, আর তুমি রিল্যাক্স করতে চাইলে নেক্সট ঠার্সডে নাইটে একাই চলে আসলা। উই ক্যান চিল।”
“ওকে, স্যার। ডান ডীল।”
“আচ্ছা, লাভার বয়ের গল্প তাহলে সেদিনই শুনব। গুডবাই।”

বার্গার খেয়ে আবার এক কফিশপে ঢুকে কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে দিল শরীফ। ট্রিপল শট এসপ্রেসো গিলেও মাথা কাজে দিচ্ছে না কোন। এমন একটা উদ্ভট লীড তাড়া করে ফিরছে যেটা নিয়ে জুনিয়র থেকে শুরু করে বস পর্যন্ত মজা নিচ্ছে। অথচ বাকি সব কটা লীড যে ডেড এন্ড, সেটাও শেষ কথা নয়। বাকি লীডগুলো পাত্তা দিলে শরীফের ভাবতে হবে যে খুনগুলো বিচ্ছিন্ন। কিন্তু সেটা মেনে নিতে পারছে না সে। শরীফের সেদিন বাসায় ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেল।
অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, শান্তা এখনও বাসায় ফিরে নি। গাড়ি নিয়ে গেছে অবশ্য আজকে। ফোন দিল, ফোন ধরল না শান্তা। আজ তো কোথায়ও যাওয়ারও কথা না। টিভি চালিয়ে বসল সে। এমন সময় শান্তা এসে ঘুকল বাসায়।
“গিয়েছিলে কোথায়?” স্ট্রেস দৃশ্যমান শরীফের গলায়।
“এটা কেমন প্রশ্ন? জেরা করছো নাকি তুমি আমাকে?” বলল শান্তা।
“নাহ সে কী করার অধিকার আছে নাকি?”
“বাজে বকছো কেন? আবার ড্রিংক করেছো তুমি?”
“নাহ, করিনি। আর করলেও কী! তুমি কোথায় যাও, কী করো কিছু বলো নাকি আমাকে?”
“হোয়াট ননসেন্স! তুমি এক কেস নিয়ে আধপাগল হয়ে আছো আর মানুষের ধার করা লাভ লেটার আমাকে এসে শোনাও, আমার কী হচ্ছে না হচ্ছে জিগ্যেস করার সময় হয়না তোমার, আর এখন বলছো আমি কিছু বলি না?”
“তুমি-”

টিভির দিকে চোখ পড়তে থেমে গেল শরীফ। ঝুলে পড়ল যেন চোয়াল। দৌড়ে রিমোট হাতে নিয়ে সাউন্ড বাড়িয়ে দিল। ব্রেকিং নিউজ। শহরতলীতে বীভৎস খুন। ভিকটিমের গলা দিয়ে বেঢপ সাইজের একটা মোবাইল ফোন ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। চাওফোনের লেটেস্ট মডেল, বেশ দামী ফোন। সরকারি কর্মকর্তা বলেই হয়ত এফোর্ড করতে পেরেছিলেন। ফোনটা ওয়াটারপ্রুফ কিন্তু তারপরেও রক্ত ঢুকে গিয়েছে কিনা সেটা নিয়ে কথা বলছে সংবাদপাঠিকা। লাশের পাশে পাওয়া গিয়েছে একটা মিউজিক প্লেয়ার। তাতে কয়েক দশক আগের একটা জনপ্রিয় বাংলা গান। গানের নাম প্রেমাতাল। গায়ক তাহসান। সেসময়ের সেলিব্রেটি কাপল ছিল তাহসান মিথিলা। পরে অবশ্য ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় বিয়ের কবছর পরে। কিন্তু প্রেমাতাল তাদের প্রেমজীবনের সাক্ষী। রিমোটটা ডিস্টার্ব করছে ইদানীং, অটো চ্যানেল চেঞ্জ হয়ে যায়। দু তিনটা চ্যানেল অটো চেঞ্জ হয়ে একটা বাংলা গানের চ্যানেল চালু হল। টিভির সাউন্ড আগেই বাড়ানো ছিল তাই ঘর জুড়ে গমগম করে উঠল তাহসানের গলা।

এ যেন সহজ স্বীকারোক্তি, আমি যুগান্তরী নই।
এ যেন ভীষণ আক্ষেপ আমার, আমি দিগ্বিজয়ী নই।
শুধু একটাই আশা আমি বুকে জড়িয়ে-
রবো সারাটি জীবন তোমায় নিয়ে।
কোনো এক নিঃসঙ্গ রোদেলা রাতে দেখেছি
প্রিয়তমা তোমার চোখে মিষ্টি হাসি,
কোনো এক দুঃসহ জোছনা দিনে বাতি নিভে গেলে
কড়া নেড়েছি তোমার হাতের ঘরে,
কিছু অর্থহীন শব্দ বুনে ডেকেছি তোমায়-
প্রেম তুমি কোথায়?
বিন্দু আমি, তুমি আমায় ঘিরে,
বৃত্তের ভেতর শুধু তুমি আছো।
মাতাল আমি তোমার প্রেমে,
তাই অর্থহীন সবই যে প্রেম লাগে।

(চলবে)

svgপ্রাক্তন: পর্ব ২ - Lost On You
svg
svgপ্রাক্তন (শেষপর্ব): পর্ব 8 - অগ্নিকাব্য

Leave a reply