Post Image
svgfahmesvgJuly 26, 2022svgFiction

প্রাক্তন (শেষপর্ব): পর্ব 8 – অগ্নিকাব্য

**reader discretion is advised**

আমি শরীফ। এই গল্পের নায়ক (নাকি খলনায়ক?)। অল্প বয়েসেই বেশ কয়েকটা ক্রিটিক্যাল কেস সল্ভ করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু এই কেসটাতে আমি একটু খাবি খেয়ে গেছি।

ব্যাপারটা যে সিরিয়াল কিলিং এটা আমি সন্দেহ আগেই করেছিলাম, কিন্তু নিশ্চিত হতে পেরেছি ৩য় খুনের পর। এটলিস্ট কিলিং প্যাটার্ন টা বুঝতে পারা গেছে, কিছু একটা গলা দিয়ে জোর করে ঢুকিয়ে দিয়ে যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু। মোটিভ? এখনও বুঝা যাচ্ছে না, কিন্তু গানগুলোর সাথেও কিছু একটা সম্পর্ক আছে। ৩য় খুনটা ইনভেস্টিগেট করার আগেই সেটার খবর ভাইরাল হয়ে গেছে। আজকাল মিডিয়া ভাল কম্পিটিশান করে পুলিশের সাথে। এখন সিরিয়াল কিলিং নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে শুরু করে আরও অনেক কিছুই হচ্ছে। আমার অবস্থা আসলেই বেশ নাজুক। কেসের কোন কূলকিনারা না করতেই এটা এখন মিডিয়া টপিক হয়ে গেছে। আবার ওদিকে শান্তার কিছু একটা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে যার কিছুই আমি বুঝতে পারছি না। তবে এসব হতেই পারে বিবাহিত জীবনে, আগেও দেখেছি সুতরাং সেটা খুব একটা পাত্তা দিলাম না। কোন ট্রেস ছাড়া এভাবে তিন তিনটা খুন- খুব অভিজ্ঞ কেউ আছে এর পেছনে। কিন্তু আমি আজও বুঝতে পারছি না, পুরো ব্যাপারটার সাথে আমি কোথা থেকে জড়িত। নাকি, ব্যাপারটা কেবল কাকতালীয়? তবে হ্যাঁ, সত্যি কথা বলতে গেলে কী, আমি বুঝতেই পারিনাই যে কত বড় বিপদে আছি, বৃহস্পতিবার বিকেলের আগে।

বৃহস্পতিবার বিকেল।
আমি দাঁড়িয়ে আছি চতুর্থ ভিকটিমের ডেডবডির সামনে। বাতাসে রক্তের গন্ধের পাশাপাশি অন্য একটা গন্ধও আছে। জিনিসটা সুগন্ধ হতে পারত। কিন্তু খুনের বেশ কিছুদিন পরে ডেডবডী আবিষ্কার হওয়াতে গলা ভর্তি ফুলগুলো পচে বিশ্রী আরও একটা গন্ধ বের হচ্ছে। আমার অবশ্য মৃতদেহ বা হত্যার উপকরণ ফুলগুলো নিয়ে কোন ইন্টারেস্ট নেই। কারণ আমি জানি আমি অনেক খুঁজেও কোন আলামত বা ছাপ খুঁজে পাবো না। আরও একটা কারণ আছে অবশ্য। আমি এই ভিকটিমকে চিনি। এই নাম আমার অনেক পরিচিত। আজ থেকে এক দশক আগে এই নাম নিয়ে অনেক কথা হয়েছিল তনিমার সাথে। তনিমা আমার প্রাক্তন। অনেক বছর আগে যখন ওর সাথে প্রেম করি প্রথম প্রথম ওর এক্স এর গল্প বলত ও। খুব ভালোবাসত নাকি ছেলেটাকে। একদিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে অন্য একটা মেয়েকে একগাদা ফুল দেয়ারত অবস্থায় হাতেনাতে ধরা খায় ছেলেটা। কী রঙের ফুল ছিল সেটাও মনে রেখেছিল তনিমা। লাল নীল সাদা। রক্ত আর বমি ভর্তি ফুলগুলো দেখেও বুঝে উঠতে সমস্যা হয়নি আমার- লাল নীল সাদা। কিছুটা কাকতালীয়? বস বলেছেন কারণ ছাড়া কোন কিছুই হয় না, আর কিছুটা কাকতালীয় বলে কিছু নেই। হয় পুরোটাই কাকতালীয়, নয় একেবারেই না!

এই সেরেছে! বসের বাসায় তো যাওয়ার কথা আজ। কিন্তু আজকের এই ডিসকভারির পর আসলে নিজেকে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না আমার। কোথায় তনিমা? কী করছে সে? কেমন আছে? এই খুনগুলোর পেছনে কী সে আছে? কিন্তু এ কী করে সম্ভব! ওর মত আদুরে আহ্লাদি মেয়ে কী করে এরকম নির্ভুল সিরিয়াল কিলিং করবে? নাকি… অন্য কেউ? অদ্ভুত একটা সম্ভাবনা মাথায় আসতেই ফেলে দিতে চাইলাম। শান্তার খারাপ কিছু করিনি আমি কোনদিন। কিন্তু গত কয়েকদিন অদ্ভুত আচরণ… ধুর! কীসব ভাবছি আমি!
আচ্ছা, আমি সম্ভবত ওভারথিঙ্ক করছি। ব্যাপারটা পুরোটাই কাকতালীয় হতে পারে। কত মানুষই খুন হয়, দুর্ভাগ্যক্রমে আজ হয়ত আমার এক্সের এক্স খুন হয়ে গিয়েছে আজ। আই হ্যাভ টু বি লজিক্যাল। মাথা ফ্রেশ করা দরকার। স্যারের ইনভাইটেশনে যাই, কালকে আবার গোড়া থেকে শুরু করব ইনভেস্টিগেশন, কোন বায়াসড অপিনিয়ন ছাড়া। ভুল যা করার করে ফেলেছি। চার চারটে মানুষ মরে গেছে আমি কিছুই করতে পারিনি, এখন শুধরাতে হবে নিজেকে।

বসের বাসার ইন্টেরিয়রের সাথে আমার বাসার ইন্টেরিয়রের আশ্চর্যজনক মিল। গ্লাস হাতে নিয়ে বসে আছি আমি। বস বোতল খুলে দিয়ে ভেতরে গিয়েছেন। বেশ কবছর আগেও বাংলাদেশে তুষারপাত হবে সেটা কল্পনায় সীমাবদ্ধ ছিল। অথচ গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর ঠেলায় এখন শীতকালে মাইনাসে চলে যায় তাপমাত্রা, আর ঘরে ঘরে শোভা পায় ফায়ারপ্লেস। একটা সময়ে এই ফায়ারপ্লেস জিনিসটা অনেক ফ্যান্টাসির উপাদান ছিল অনেকের কাছে। আজ সেটা নিত্য ব্যবহার্য এক জিনিস।

“গান ছেড়ে দিই, কেমন? হোম থিয়েটারের পেছনে ম্যালা টাকা খরচ করেছি”, বস এসে পাশে বসলেন কাউচ টেনে।
“শিওর স্যার, তবে একটা কথা বলি যদি কিছু মনে না করেন?” একটু ইতস্তত করে বলল শরীফ।
“প্লীজ, গো এহেড।”
“স্যার, আজ কি আমরা কেসটা নিয়ে কোন কথা না বলতে পারি? আমি কালকে থেকে আবার গোড়া থেকে শুরু করতে চাচ্ছি, কারণ আমি পার্সোনাল কিছু বায়াসের কারণে মনে হয় ভজকট করে ফেলেছি সব। তার ওপর আজকের ভিকটিম আবার আমার এক্সের এক্স।”
“ওয়েট ওয়েট, হোল্ড অন, কী বলছো?”
“জ্বি স্যার, আই এম শিওর।”
“দিস মাস্ট বি হার্ড অন ইউ, বুঝতে পারছি। আচ্ছা, তোমাকে তাহলে এটা নিয়ে কিছু না বলি আজকে, যদিও মাথায় অনেক কিছু কিলবিল করছে।”
“আমার এক্স কে নিয়ে আলাপ করা যায়, যদি আপনি তাই জানতে চান। এটা কেসের সাথে সম্পর্কিত না। আশা করছি আরকি। হাহাহা।”

মাথাটা একটু দুলে উঠল। আজ একটু বেশিই খাওয়া হচ্ছে, এজন্য বোধহয়, নাকি একটানা আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে?

আবারও চুমুক দিয়ে বসকে বলা শুরু করলাম তনিমার কথা। অদ্ভুত একটা প্রেম ছিল সেটা। ওভারলি এটাচড রিলেশনশিপ। শেষটাও খুব অদ্ভুতভাবে হয়েছিল। পালিয়ে বিয়ে করার কথা ছিল আমাদের। সেদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিল হুট করেই, আর আমি একটু বেশিই খেয়ে ফেলেছিলাম, আজকের মতোই। তাই যেখানে দেখা করার কথা সেখানে আর যাইনি। তনিমা বৃষ্টিতে একা একা দুঘণ্টা ভেজার পর আমার ইন্সটাগ্রাম স্টোরি দেখে বুঝতে পারে যে আমি মাতাল। মেয়েটা খুব জেদি ছিল। জানত আমার এই অকশনাল ড্রিঙ্কিং প্রব্লেম এর কথা, অনেকবার অনেক ভোগান্তিও নিয়েছে সে এর আগে। কিন্তু আমাকে স্বাভাবিক করার জন্য অনেক এফোর্ট দিয়েছিল সে এতদিন। আমি ভাল হয়েও যাচ্ছিলাম আস্তে আস্তে, কিন্তু ওদিন কী মনে করে নিজেই একা নিজের ব্যাচেলর পার্টি করতে গিয়ে…
একটা ওপেন এয়ার ওয়েডিং এর আয়োজন ছিল। কাছের কজন ছিল ওখানে। সবাইকেই দাঁড় করিয়ে রেখেছিলাম। কারো ফোনই ধরিনি সেদিন। পরে মাতলামির ঘোরে স্টোরিতে আপ দিয়ে দিয়েছিলাম বারের ছবি, দেখে কাউকে কিছু না বলে পার্কের ঠিক মাঝে দুঘণ্টা দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজেছিল। কারো বারণ শোনেনি। অনেক কষ্ট পেয়েছিল মনে হয়। আর আমিও আর পরে যোগাযোগ করার চেষ্টা করিনি। কেন যেন মনে হচ্ছিল আমি রেডি না এসব এর জন্যে। এরপর আর কোনদিন তনিমার সাথে দেখা বা কথা হয়নি আমার। শুধু আজকে আমার আগের প্রেমিকের ডেডবডি দেখলাম, এত বছর পর।

“গলা শুকিয়ে গিয়েছে দেখি তোমার, দাঁড়াও আরেকটা বোতল নিয়ে আসতে বলি, আর আমার ওয়াইফের সাথে তো তোমার পরিচয় হয় নি।” বস আমাকে বলে এরপর বউ কে ডাকলেন।
“এই, আসো না। আর গানটা ছেড়ে দিয়ে আসো। জয়েন আস।”

সনির লেটেস্ট হোম থিয়েটার। আর গানটার সঙ্গীতায়োজন অসাধারণ। তাই অদ্ভুত এক ভাল লাগা ছড়িয়ে পড়ল আংশিক পচা কিডনিটার পাশেই কোথাও, যেখানে অন্তর থাকে মানুষের।

হাঁটছি আমি নিষ্প্রাণ হয়ে কোনো অজানা গন্তব্যে,
আক্ষেপগুলো ফিরিয়ে নিলাম গোছানো ডায়রিতে।
বাস্তবতা মেনে নিয়েছি স্বপ্নের বিপরীতে-
স্বপ্নগুলো উঁকি দিয়ে যায় মনের বন্ধ জানালাতে-
আমি হেরে গেছি এই বাস্তবতার মঞ্চে,
যেখানে ছিল না কোনো অভিনেতার অভিপ্রায়-
আমি ভেসে গেছি এই বাস্তবতার স্রোতে-
পাবেনা আর কখনো কুড়িয়ে আমায়।

আর মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেল একটা শীতল স্রোত। আর্টরেক এর এই আন্ডাররেটেড গানটা তনিমার খুব প্রিয় ছিল। ঝগড়া হলেই খালি লুপে ছেড়ে শুনত। এমনো হয়েছে, আমি ড্রাইভ করছি, সে ব্লুটুথ কানেক্ট করে টানা এক ঘণ্টা বাজিয়েছে এই গান। আমার গাড়িতে আলাদা ঊফার লাগানো থাকায় বদ্ধ স্পেসে খুব ভাল লাগত শুনতে গানটা। আর আমার মধ্যে এক ধরনের অনুতাপ কাজ করত, যে কারণে মিটিয়ে ফেলতাম সবকিছু কিছুক্ষণ পরেই।

আমি ঘাড় ঘুরিয়ে বসের দিকে তাকালাম। কষ্ট হল কাজটা করতে, নেশা ধরেছে বোধহয়। কিন্তু উনি আমার পেছনে কারো দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, “এসো তনিমা।”

“দশ বছরে খুব একটা পাল্টায়নি তোমার চেহারা।” বললাম তনিমাকে।
“আর বস, আসলেই কারণ ছাড়া কন কিছুই হয়না। বুঝতে পারলাম অবশেষে। এত্ত ক্লিন মার্ডার, কোন আলামত ছাড়া করে আসা প্রফেশনাল কিলার ছাড়া আর একজনের পক্ষেই সম্ভব। প্রফেশনাল কিলার- হান্টার।” বসের দিক তাকিয়ে মাথা হালকা নামালাম।
” আগের জন নাহয় তোমার প্রাক্তন ছিল, বাকিরা কি করেছে?” তনিমার দিকে তাকালাম আবার।

“উমম, লেটস সী। প্রথমজন ছিল বাচ্চাকালের ক্রাশ। প্রেম নিবেদন করেছিলাম। সবার সামনে পূর্ণতা গানটা গেয়ে। অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছিল আর চড় মেরেছিল। দ্বিতীয়জন তো মহা পল্টিবাজ ছিল। এক সাথে কত জনকে কবিতা লিখত জানতামই না! ৩য় জন ফোনে টেক্সট দিয়েই ব্রেকআপ করেছিল বিনা নোটিশে। আর চতুর্থজন আমার সামনেই ফুল দিয়ে আরেক মেয়েকে.. “

হাত তুলে থামিয়ে দিলাম তনিমাকে। একটানা কথা বলে যাওয়ার স্বভাবটা আজও রয়ে গেছে। হাতটা কেন দশ মণ ওজনের লাগছে সেটা বুঝতে পারছি না।

“কিন্তু তোমার কয়জন প্রাক্তন প্রেমিক ছিল এটা রিলেশনশিপে থাকা অবস্থায় আমাকে বলোনি তোহ! এখন অবশ্য জানি, চারজন। ” স্মিত হাসিতে বললাম বসের বউকে।

“ভুল বললে শরীফ। পাঁচ।”

পৃথিবীতে আমার শোনা শেষ শব্দ ওটাই ছিল।


পরিশিষ্ট:
রিমোটটা ঠিক করা হয়নি আর শরীফের ড্রয়িং রুমে্র টিভিটার। খালি বাসায় হুট করে অন হয়ে গেল টিভিটা। সংবাদ পাঠিকা খবর পড়ছেন- ইন্টেলিজেন্স অফিসার শরীফের ডেডবডি আবিষ্কার হয় তার বাসার বেডরুমে। পেটভর্তি পানি ছিল। পানি গিলিয়ে মারা হয়েছে তাকে। খুনী সন্দেহে তার স্ত্রী শান্তাকে এরেস্ট করে পুলিশ। ধারণা করা হচ্ছে আগের চারটে খুনের পেছনেও শান্তা আছেন, এমনকি শরীফ নিজেও থাকতে পারেন এমন মন্তব্য করছেন ইন্টারনেটবাসী। টিকটকে ট্রেন্ডিং আছে সিরিয়াল কিলার শান্তা শরীফ হ্যাশট্যাগ, অনেকে ভিডিও আপলোড করছেন, বিশেষজ্ঞরা আতংক প্রকাশ করেছেন যে এতে করে সিরিয়াল কিলিং এ অনেকে অনুপ্রেরণা পেতে পারেন… “

svgপ্রাক্তন: পর্ব ৩ - প্রেমাতাল
svg
svgThe day I slept in a coffin

Leave a reply